পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে কেন এখনো পোলিও আছে?
Community Medicine পড়ার সময় আমরা নিশ্চই পড়েছি যে, সারা বিশ্বজুড়ে যখন পোলিও প্রায় নির্মূল, তখনো পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে wild-type polio virus এখনো রয়ে গেছে। কিন্তু কেন? Continuous যুদ্ধ তো অবশ্যই যার কারণে স্বাস্থ্যকর্মীরা ভালোভাবে কাজ করতে পারে না, সাথে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর আক্রমণ তো আছেই। তবে আরেকটা চাঞ্চল্যকর দৃষ্টিকোণ থেকে এর পেছনের কারণ খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০১০-২০১১ সালে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-এর একটি গোপন এবং চরম বিতর্কিত অভিযানের ইতিহাসে।
২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে সিআইএ গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে জানতে পারে যে, ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের আবোতাবাদ শহরে লুকিয়ে আছেন। কিন্তু এর ১০০% কনফার্মেশনের জন্য প্রমাণ প্রয়োজন ছিল। এই প্রমাণ জোগাড় করতে সিআইএ একটি অভিনব কিন্তু অনৈতিক পথ বেছে নেয়, একটি ভুয়া হেপাটাইটিস-বি টিকাদান কর্মসূচি।
তাদের উদ্দেশ্য ছিল ওই কম্পাউন্ডের শিশুদের রক্তের মাধ্যমে ডিএনএ (DNA) সংগ্রহ করা এবং লাদেনের মৃত বোনের ডিএনএ-এর সাথে তা মিলিয়ে দেখা। এই কাজের জন্য তারা ডা. শাকিল আফ্রিদি নামে একজন পাকিস্তানি চিকিৎসককে রেক্রুট করে। তিনি স্থানীয় কিছু স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়োগ দেন। প্রথমে একটি গরিব এলাকায় এবং পরে লাদেনের কম্পাউন্ডের কাছে এই টিকাদান চালানো হয়। কিন্তু তাদের এই মিশন সফল হয়নি, অন্যান্য সার্ভেইলেন্সের মাধ্যমেই বিন লাদেন কোথায় আছেন এটা কনফার্ম করতে হয়েছিলো শেষ পর্যন্ত।
২০১১ সালের মে মাসে U.S. Navy SEAL ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে। এর দুইমাস পর, জুলাই মাসে ব্রিটিশ পত্রিকা 'দ্য গার্ডিয়ান' সিআইএ-এর এই ভুয়া টিকাদান কর্মসূচির খবর ফাঁস করে দেয়।
খবরটি প্রকাশ হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠে। আমেরিকার শীর্ষ ১২টি জনস্বাস্থ্য স্কুলের ডিনরা তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে একটি খোলা চিঠি লিখে এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, চিকিৎসা সেবাকে গুপ্তচরবৃত্তির ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা চিকিৎসাবিজ্ঞানের নীতিবিরুদ্ধ। শেষমেশ হোয়াইট হাউস প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য হয় যে, সিআইএ আর কখনো গুপ্তচরবৃত্তির জন্য টিকাদান কর্মসূচি ব্যবহার করবে না। কিন্তু ততদিনে পাকিস্তানের বিশাল ক্ষতি হয়ে গেছে।
ভ্যাক্সিন বিরোধী গোষ্ঠীগুলো আগে থেকেই আধুনিক চিকিৎসা ও টিকার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাতো। তাদের দাবি ছিল:
- পোলিও বা অন্যান্য টিকাদান কর্মসূচি মূলত ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের একটি ষড়যন্ত্র, যার উদ্দেশ্য মুসলিম শিশুদের বন্ধ্যা করে দেওয়া বা তাদের বৃদ্ধি রোধ করা।
- টিকায় শুকরের চর্বি মেশানো থাকে, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।
সাধারণত অনেক মানুষই এসব কথা বিশ্বাস করত না। কিন্তু সিআইএ-এর ভুয়া কর্মসূচির খবর প্রকাশ পাওয়ার পর, এই ভিত্তিহীন দাবিগুলো সাধারণ মানুষের কাছে হঠাৎ করেই "সত্য প্রমাণ" হিসেবে হাজির হয়। পোলিও ড্রপ বা অন্যান্য ভাক্সিন যে পশ্চিমা ষড়যন্ত্র, এই বহুল প্রচলিত গুজবের একটি বাস্তব প্রমাণ পেয়ে যায় পাকিস্তানের সাধারণ জনগণ। মানুষের মনে টিকার প্রতি যে গভীর অবিশ্বাস ও ভীতির সৃষ্টি হয়, তা আজও দূর হয়নি।
এর ফলাফল হয় ভয়াবহ:
- 1.ভ্যাকসিন গ্রহণে অস্বীকৃতি: পশ্চিমা বিশ্ব টিকার আড়ালে গুপ্তচর পাঠায়, এই ভয়ে অনেক পরিবার তাদের শিশুদের পোলিও টিকা দেওয়া বন্ধ করে দেয়।
- 2.স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা: টিকাদানকারী কর্মী (যাদের বেশিরভাগই নারী) ওপর নিয়মিত সশস্ত্র হামলা শুরু হয়। স্বাস্থ্যকর্মীদের গুপ্তচর বা পশ্চিমা দালাল হিসেবে সন্দেহ করা হতে থাকে।
এই চরম অবিশ্বাস, গুজব এবং নিরাপত্তার অভাবেই পাকিস্তান এবং তাদের পার্শ্ববর্তী আফগানিস্তানে পোলিও টিকাদান কর্মসূচি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। চিকিৎসা সেবার মতো একটি পবিত্র এবং নিরপেক্ষ বিষয়কে সামরিক গুপ্তচরবৃত্তির কাজে ব্যবহার করার কারণেই এই অঞ্চলে wild polio virus আজও টিকে থাকার সুযোগ পেয়েছে।
উল্লেখ্য, ডা. আফ্রিদিকে ৩৩ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং ২০২৫ সালে ডা. আফ্রিদির বদলে ড. আফিয়া সিদ্দিকীকে Exchange এর প্রস্তাব দেয়া হলেও পাকিস্তান সরকার তা নাকচ করে দেয়।



