বাল্যবিবাহ, চিকিৎসা বিজ্ঞান ও সামাজিক মুল্যবোধ
লুবাবার বিয়ে এবং বাল্যবিবাহ নিয়ে বন্ধু, রুমমেট, ডানপন্থী-বামপন্থী সকলের মাঝে অনেক তর্কবিতর্ক দেখছি গতকাল থেকে। দুইপক্ষই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিকে এবসোলিউট ভাবেন, নিজেদের অবস্থানকে ডিফেন্ড করেন। লেফট কিংবা রাইট দুইদিককে নিরপেক্ষ রেখে, একজন মেডিকেল কমিউনিটির সদস্য ও সচেতন নাগরিক এর দৃষ্টিকোণ থেকে এই বিষয়ক সমস্যাগুলো এড্রেস করা এবং উভয়ের মাঝামাঝি এর যৌক্তিক সমাধানই বা কি হতে পারে এই নিয়েই আজকের অনুসন্ধান ও লেখা।
আমাদের মাঝে প্রচলিত সবচেয়ে কমন যুক্তিটি হলো, "১৪-১৫ বছর বয়সে ছেলেমেয়েদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন বা জৈবিক চাহিদা(Sexual Desire) তৈরি হয়, তাই তাদের ভুল পথে যাওয়া ঠেকাতে অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া উচিত।" কথাটি সামাজিক মুল্যবোধের দিক থেকে যৌক্তিক, কিন্তু একজন চিকিৎসকের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করতে গেলে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের মাথায় রাখতে হবে।
আমাদের মানবদেহ সামাজিক নিয়মগুলো মেনে চলে না। বিয়ের জন্য কবুল বললে বা বয়ফ্রেন্ডের সাথে মেলামেশা করলেই একটি ১৫ বছরের মেয়ের শরীর রাতারাতি পরিণত হয়ে যায় না!
আমাদের গ্রামের বা রুরাল এরিয়ার মানুষের একটি ভুল ধারণা হলো, একটি মেয়ের মাসিক বা ঋতুস্রাব শুরু হওয়া মানেই সে মা হওয়ার জন্য সম্পুর্ণ প্রস্তুত। হরমোনাল দিক থেকে বিষয়টা সত্য যে, একটা বাচ্চা ১৪-১৫ বছর বয়সেই গর্ভধারণ করার সক্ষমতা রাখে, কিন্তু তার পেশীতন্ত্র ও কঙ্কালতন্ত্র (Musculoskeletal system) তখনো অনেকটা অপরিণত থাকে।
একটা মেয়ের পেলভিস বা কোমরের হাড় (যে পথ দিয়ে শিশু জন্ম নেয়) ২০-২২ বছর বয়স পর্যন্ত তা বাড়তে থাকে। এখন ১৪-১৫ বছরের একটি মেয়ে যখন গর্ভবতী হয়, তখন তার সরু পেলভিসের ভেতর দিয়ে শিশুর মাথা বের হতে পারে না। ফলে Obstructed Labor সৃষ্টি হতে পারে। এ অবস্থায় জরুরি সিজার করা না হলে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা শিশুর মাথার চাপে মায়ের শরীরের ওই অংশের রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং পচন ধরে, আর বাচ্চাকে তো বাচানো যায়ই না। এছাড়া একটোপিক প্রেগন্যান্সি, প্রি-অ্যাক্লাম্পসিয়া, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ (Postpartum Hemorrhage) এবং মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকিও থাকে বহুগুণ বেশি। বাচ্চার ওজন কম(LBW) হওয়া, বাচ্চার অপুষ্টি, মায়ের অপুষ্টিও কমন অনেক এই আর্লি প্রেগনেন্সিতে। আর অবস্টেট্রিক ফিস্টুলা (Fistula) হওয়ার ঝুঁকি তো বাড়েই। ফিস্টুলায় আক্রান্ত এই রোগীগুলো সামাজিকভাবে বড়ই অসহায় ও একঘরে হয়ে পড়ে।এই রোগীদের সাথে কথা বলতে গেলে দেখা যায়, লজ্জায়-কষ্টে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। একটি তথাকথিত চাহিদা মেটাতে গিয়ে আমরা ১৫ বছরের একটি মেয়েকে সারাজীবনের জন্য এমন এক যন্ত্রণার দিকে ঠেলে দিচ্ছি, যার কারণে সমাজ তাকে অচ্ছুত করে রাখতে পারে!
গর্ভধারণের ঝুঁকির বাইরেও আরেকটি ভয়াবহ বিপদের নাম, জরায়ুমুখ ক্যান্সার (Cervical Cancer)। কিশোরী বয়সে একটি মেয়ের জরায়ু মুখটি শারীরিকভাবে পুরোপুরি পরিণত হয় না। এই অপরিপক্ব অবস্থায় যখন মেয়েটি শারীরিক সম্পর্কে জড়ায়, তখন এইচপিভি (HPV) নামের একটি মারাত্মক ভাইরাস খুব সহজেই সেখানে সংক্রমণ ঘটায়। ভ্যাকসিন না নেয়া থাকলে এই অল্প বয়সী মেয়েদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এই ভাইরাসটিকে আটকাতে পারে না। পরবর্তীতে ১৫-১৭ বছর বা আরও কিছুকাল পর এটি জরায়ুমুখের ক্যান্সারের রূপ নেয়। পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় আমাদের মতো যেসব দেশে বাল্যবিবাহ বেশি এবং ভ্যাকসিনেশন কাভারেজ কম, সেসব দেশে জরায়ুমুখ ক্যান্সারে নারীদের মৃত্যুর হার তুলনামূলক অনেক বেশি।
পশ্চিমারা পারলে আমরা কেন নয়?
অনেকেই পশ্চিমাদের উদাহরণ টেনে বলেন, ওদের দেশে যদি ১৬ বছরে শারীরিক সম্পর্ক করা যায়, একসাথে থাকা যায় লিগ্যালি, তবে আমরা হালালভাবে বিয়ে দিলে সমস্যা কোথায়?
চিকিৎসক হিসেবে আমাদের উত্তরটি খুব সহজ। পশ্চিমা দেশে ১৬ বছরের সম্পর্কের সাথে দ্রুত সন্তান জন্ম দেওয়ার কোনো সামাজিক বা পারিবারিক চাপ থাকে না। পাশাপাশি তাদের শিক্ষার হার, ভ্যাকসিনেশন কাভারেজ, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং কন্ট্রাসেপটিভ সম্পর্কে জ্ঞান আমাদের দেশের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু আমাদের সমাজে, বিয়ের কাবিননামা মানেই হলো দ্রুত সন্তান নেওয়ার একটি নীরব নির্দেশনা! অনেক পরিবারে, ১৬ বছরের একটি মেয়েকে বিয়ের এক বছরের মধ্যেই প্রমাণ করতে হয় সে মা হতে পারে কি না। এখানে আমাদের রাষ্ট্রেরও কিছুটা ব্যর্থতা রয়েছে যে, আমরা প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের মাঝে পর্যাপ্ত সচেতনতা ও শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে পারিনি।
অল্প বয়সে বিয়ে হোক বা অনৈতিক সম্পর্ক হোক, একটি মেয়ের শরীর এবং HPV ভাইরাস কিন্তু বোঝে না সম্পর্কটি হালাল নাকি হারাম! তার হাতে বিয়ের কাগজ থাকুক আর না থাকুক, অল্প বয়সে প্রেগনেন্সির রিস্ক এবং ক্যান্সারের রিস্ক দুই ক্ষেত্রেই বেশি থাকে। বাল্যবিবাহ ঠেকানোর অর্থ কাউকে খারাপ পথে ঠেলে দেওয়া নয়, বরং একটি অবুঝ মেয়েকে নিশ্চিত মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে বাঁচানো।
বাস্তবসম্মত সমাধান কী হতে পারে?
চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতাগুলো যেমন তুলে ধরা জরুরি, ঠিক তেমনি একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে সামাজিক অবক্ষয়গুলো মোকাবিলা করাও আমাদের দায়িত্ব। বয়স বাড়ার সাথে সাথে শারীরিক বা মানসিক পরিবর্তনগুলো যেমন একটি প্রাকৃতিক সত্য, তেমনি অল্প বয়সে মা হওয়ার চিকিৎসাগত ঝুঁকিগুলোও সত্য। এই দুইয়ের মাঝে আমরা একটি সুন্দর ও বাস্তবসম্মত মধ্যমপন্থা বেছে নিতে পারি:
বিয়ে আগেই হতে পারে, তবে সংসার পরে:
যদি পরিবার বা ছেলে-মেয়েরা নিজেরাই মনে করে নিজেদের সামাজিকভাবে এবং ধর্মীয়ভাবে সুরক্ষিত রাখা দরকার, তবে শুধু আকদ বা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতাটুকু করে রাখা যেতে পারে। কিন্তু মেয়ের বয়স অন্তত ১৮ বা ২০ না হওয়া পর্যন্ত তাকে নিজের বাড়িতেই রাখা উচিত। এতে সম্পর্কটি যেমন হালাল থাকলো, সাথে মেয়েটি পড়ালেখা করার এবং শারীরিকভাবে পরিণত হওয়ারও সুযোগ পেলো। পাশাপাশি ছেলেটিও মানসিক ও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সময় পাবে। অনেকেই বলতে পারেন, এটা তো কোনোভাবেই সম্ভব না, বিয়ের পর আবার আলাদা রাখা যায় নাকি। বলে রাখা ভালো, বয়ফ্রেন্ড-গার্লফ্রেন্ড কালচারে সম্ভব হলে এটিও প্র্যাক্টিক্যালি সম্ভব যদি দুই পরিবারই সচেতন ও সাপোর্টিভ থাকেন। এমন সচেতন পরিবার আসতে আসতে হয়তো আমাদের আরো শত বছর অপেক্ষা করতে হতে পারে, কিন্তু স্বপ্ন দেখতে ও পরিকল্পনা করতে তো কোনো নিষেধ নেই, আমাদের হাত ধরেই আসতে পারে পরিবর্তন।
এই আলোচনায় এখন, প্রগতিশীল দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হতে পারে, এত আগে বিয়ে দিলে ছেলেমেয়েরা দায়িত্বের বোঝায় পড়াশোনা ছেড়ে দিবে এবং ক্যারিয়ারে ফোকাস করতে পারবে না। অন্যদিকে রক্ষণশীল দৃষ্টিকোণ থেকে কাউন্টার যুক্তি আসতে পারে, রিজিকের মালিক আল্লাহ। এই দুইয়ের মাঝে চমৎকার একটি সমাধান হতে পারে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও পারিবারিক সাপোর্ট। বিয়ে করেই কেউ যেন পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে, সেজন্য সচেতনতা, এডুকেশন লোন, কর্মক্ষেত্র বৃদ্ধি এবং পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক মানসিক সমর্থন প্রয়োজন। বিজ্ঞানমনস্ক, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি শিক্ষিত সমাজ গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত, এবং কালচারাল রেভ্যুলেশন এর মাধ্যমে এই পরিবর্তন অবশ্যই সম্ভব। হলিউড-বলিউডের মুভি-সিরিজ দেখে অজান্তেই আমাদের মাঝে মনস্তাত্ত্বিক একটি ডাবল স্টান্ডার্ড তৈরি হয়েছে, যে আমরা স্বাস্থ্যঝুকির কথা বলে ১৮ বছরের আগের বিয়ের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছি, সেই আমরাই, ১৮ বছরের এর আগের গার্লফ্রেন্ড-বয়ফ্রেন্ড কালচারকে নর্মাল ভাবছি, হতে পারে ইন্টিমেসিটা কম, কিন্তু একেবারেই নেই, তা অস্বীকার করবার উপায় নেই, বরং এটা বাড়ছে, এবং এটাতেও স্বাস্থঝুকি আছে। এই ধরনের একটা কালচারাল মনোভাবকে আরেকটা বেটার কালচারাল মনোভাব দিয়ে রিপ্লেস করতে পারলেই কেবলমাত্র পরিবর্তন সম্ভব।
সন্তান গ্রহণে পরিবার ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব:
যদি কোনো কারণে ১৮ বছরের আগেই বিয়ে হয়ে যায় এবং স্বামী-স্ত্রী একসাথে থাকতে শুরু করে (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রুরাল এরিয়াতে হচ্ছেও), তবে পরিবারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তাদের ওপর সন্তান নেওয়ার চাপ প্রয়োগ না করা এবং মেয়ের বয়স অন্তত ২০ বছর না হওয়া পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করা, এবং বিয়ে কনজিউমেট করার আগেই HPV ভ্যাকসিন নিশ্চিত করা। আর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপারে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে একটি সচেতন তরুণ প্রজন্ম তৈরি করা এবং নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য জন্মনিয়ন্ত্রণের ইকুইপমেন্টগুলো সহজলভ্য করা।
ক্যান্সারের টিকা (HPV Vaccine):
মেয়েদের অল্প বয়স বা বৈবাহিক অবস্থা যাই হোক না কেন, জরায়ুমুখের ক্যান্সার রোধে অবশ্যই তাদের এইচপিভি (HPV) টিকা দিতে হবে। দেশের Economic Burden ও মৃত্যুহার কমানোর জন্য সরকারিভাবে স্ক্রিনিং প্রোগ্রামগুলোও সম্প্রসারণ করতে হবে।
আরো কিছু কথা,
আমাদের সমাজে আরেকটি ভয়াবহ সমস্যা হচ্ছে পর্নোগ্রাফির আসক্তি। এটি শুধু অল্প বয়সে বিয়ে দিয়ে আটকানো সম্ভব নয়, বিবাহিতদের মাঝেও এই আসক্তি রয়েছে, যা দাম্পত্য জীবনে অশান্তির অন্যতম কারণ। তাই, ১৪-১৫ বছর বয়সের মানসিক ও শারীরিক শক্তি ও উদ্দীপনাকে শুধু বিয়ের দিকে ধাবিত না করে, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং সৃজনশীল কাজেও বেশি বেশি যুক্ত করা উচিত। তারা ইন্টারনেটে কী ধরনের কনটেন্ট গ্রহণ করছে, তা নজরদারি করা প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা, এই সময়টাতে পরিবারের উচিত তাদের সন্তানদের সাথে একটি সুন্দর ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
সবশেষে এটাই বলতে চাই, বিয়ে কেবল শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের লাইসেন্স বা জৈবিক চাহিদা মেটানোর মাধ্যম নয়। এর অর্থ হলো, দুটো মানুষের আজীবন একসাথে থাকা এবং একটি সুস্থ-সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পৃথিবীতে নিয়ে আসা, যারা যুগের পর যুগ ধরে সভ্যতার এই নৌকাকে আরো সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। একটি মেয়ের শরীর যতদিন পর্যন্ত মা হওয়ার ধকল সহ্য করার জন্য প্রস্তুত না হচ্ছে, ততদিন তাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসানো বা সন্তান নেওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা বা আবেগের বসে নিজে থেকেই সন্তান নেয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। তাই, সুস্থ সমাজ ও সুস্থ প্রজন্মের স্বার্থে নিজেদের সচেতন হওয়া জরুরি।



